যার জন্য পরিচিত
- ১
রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী।
মুঘলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এই জমিদার ১৬৯৭–৯৮ সালে মধুমতীর তীরে মহম্মদপুরে রাজধানী গড়েন: পরিখাঘেরা চৌকো দুর্গ, প্রতিটি বাহু প্রায় ৪০০ মিটার, ভেতরে প্রাসাদ, মন্দির আর জলাশয়। তার ধ্বংসাবশেষ, ১৬৯৯ সালের দশভুজা মন্দির আর তলা পর্যন্ত ইটে বাঁধানো লক্ষ্মীনারায়ণের পুকুর আজও আছে; তাঁকে নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন উপন্যাস ‘সীতারাম’।
- ২
কিংবদন্তির নিচে বৌদ্ধবিহার।
টিলা গ্রামের মানুষ ঢিবিটিকে বলেন ভাতের ভিটা: এক দরবেশ রাতভর মসজিদ গড়ছিলেন, ভোরে তা অসমাপ্ত রেখে চলে যান, এমন গল্প থেকে নাম। খননে বেরিয়েছে মৌর্য থেকে গুপ্ত যুগের মধ্যকার এক বৌদ্ধবিহার, পাহাড়পুরের মতো ছোট ছোট কক্ষ নিয়ে।
- ৩
কাত্যায়নী পূজা।
দুর্গাপূজার মাসখানেক পর, নভেম্বরে, মাগুরা পালন করে নিজস্ব পাঁচ দিনের কাত্যায়নী পূজা। ১৯৫০ সালে শহরে এর শুরু; আজ জেলাজুড়ে প্রায় নব্বইটি মণ্ডপ, আলোয় সাজানো তোরণ, মেলা, আর দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী।
- ৪
শ্রীপুরের জমিদার বাড়ি আর কবিদের গ্রাম।
শ্রীপুরের পাল চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের ‘বৌ-ঠাকুরানীর হাট’-এর কাহিনি: এ বাড়ির মেয়ে বিভা বিয়ে করেছিলেন যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্যকে। কাছের গ্রামে দুই কবির বাড়ি: মাঝাইলে ফররুখ আহমদ, মুজদিয়ায় কাজী কাদের নওয়াজ।
- ৫
চণ্ডীদাস ও রজকিনী।
শালিখার শতখালীতে স্থানীয় স্মৃতি মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাস আর তাঁর প্রিয় রজকিনীর বাস দেখায়। যে দহে তিনি বড়শিতে মাছ ধরতেন, লোকে তা দেখায়; দহের ওপারে রজকিনীর নামে ধোপাখালী পাড়া, যেখানে আজও পুরোনো মাটির পাত্রের টুকরো মেলে।
- ৬
নদী, বাঁওড় আর শতবর্ষী ঘোড়দৌড়।
শহরের মাঝ দিয়ে নবগঙ্গা, পূর্ব সীমানায় গড়াই–মধুমতী, আর মাঠের মধ্যে সিরিজদিয়া ও ঘোপ বাঁওড়ের মতো মরা নদীর বাঁক। বাবুখালীতে আনুমানিক ১৮৯৮ সাল থেকে ১৬ মাঘ বসে ঘোড়দৌড় আর তিন দিনের মেলা।
সেরা মৌসুম
ভালোমোটামুটিনভে–ফেব্রু
- কাত্যায়নী পূজা নভেম্বরে পাঁচ দিন, দুর্গাপূজার মাসখানেক পর; জেলাজুড়ে আলোকিত মণ্ডপ
- বাবুখালীর ঘোড়দৌড় ও মেলা ১৬ মাঘ (জানুয়ারির শেষ), মহম্মদপুরে, আনুমানিক ১৮৯৮ থেকে; তিন দিনের মেলা ও জারি গান
- নবান্ন হেমন্তে নতুন ধানের উৎসব
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আসার সেরা সময়। বৃষ্টি তখন শেষ (নিকটতম আবহাওয়া কেন্দ্র যশোরে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বৃষ্টি ২৫ মিলিমিটারের কম), দিন উষ্ণ ও পরিষ্কার, আর জানুয়ারির রাতে তাপমাত্রা নামে প্রায় ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে; নদীর পাড়ে সন্ধ্যার জন্য হালকা গরম কাপড় রাখুন।
মার্চ থেকে মে গরম বাড়ে, এপ্রিল-মের দুপুরে তাপমাত্রা প্রায় ৩৬ ডিগ্রি। বর্ষায় জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঝরে বছরের প্রায় সবটুকু, ১,৬৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি; শুধু জুলাইয়েই প্রায় ৩৭০ মিলিমিটার। নদী আর বাঁওড় তখন ভরা, তবে ধ্বংসাবশেষের পথে গ্রামের রাস্তা কাদায় ভরে যায়।
সম্ভব হলে কোনো উৎসব ধরে আসুন। নভেম্বরে, দুর্গাপূজার মাসখানেক পরে, পাঁচ দিন কাত্যায়নী পূজার আলোকিত মণ্ডপে ভরে থাকে শহর। জানুয়ারির শেষে, ১৬ মাঘ, মহম্মদপুরের বাবুখালীতে বসে ঘোড়দৌড় আর মেলা, সঙ্গে জারি ও সারি গান।
কীভাবে যাবেন
বাস
ঢাকা থেকে
প্রায় ৩ ঘণ্টা
এশিয়ান হাইওয়ে ১ ধরে সড়কপথে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার; বাস থামে কেন্দ্রীয় টার্মিনাল, ঢাকা রোড ও ভায়না মোড়ে।
ট্রেন
যশোর হয়ে
মাগুরায় রেলপথ নেই; সবচেয়ে কাছের স্টেশন যশোর, সেখান থেকে বাসে উত্তরে।
আকাশপথ
যশোর হয়ে
সবচেয়ে কাছের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর যশোর; সেখান থেকে বাসে মাগুরা।
ঘুরে বেড়ানো
জেলার ভেতরে
বাস, টেম্পু, ইজিবাইক ও ভ্যান; মহম্মদপুর ২৫ কিলোমিটার পূর্বে, শ্রীপুর ১৫ কিলোমিটার উত্তরে, আড়পাড়া ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে।
বাসেই যেতে হয়: মাগুরায় রেলপথ নেই। ঢাকা থেকে সড়কপথে এশিয়ান হাইওয়ে ১ ধরে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার, বাসে লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। শহরে বাস থামে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, ঢাকা রোড স্টপ আর ভায়না মোড় স্ট্যান্ডে; ভায়না মোড় সেই বড় গোলচত্বর, যেখানে ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, শ্রীপুর ও নড়াইলের সড়ক মিলেছে।
ট্রেনে বা বিমানে এলে নামুন যশোরে, সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর; সেখান থেকে বাসে উত্তরে।
জেলার ভেতরে বাস, টেম্পু, ইজিবাইক আর ভ্যানেই সব জায়গায় যাওয়া যায়। মহম্মদপুর আর সীতারাম রায়ের দুর্গ প্রায় ২৫ কিলোমিটার পূর্বে, সরাসরি বাস আছে; শ্রীপুর ১৫ কিলোমিটার উত্তরে; শালিখার প্রবেশপথ আড়পাড়া ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে; ভাতের ভিটা যশোর সড়ক ধরে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে।
স্থানীয় খাবার
মাগুরা কৃষির জেলা, আর এর খ্যাতি গাছে ফলে: আম, কাঁঠাল, লিচু আর কলা প্রধান ফল; আম-লিচুর জন্য গ্রীষ্মের শুরুতে আসুন।
সবচেয়ে পুরোনো গল্পটি ধানের। শালিখার নামকরণের এক জনশ্রুতি বলে, শেরশাহের সড়ক বানানোর সময় শ্রমিকেরা এখানকার শালি ধানের চিড়া খেয়ে তৃপ্ত হয়ে জায়গার নাম রাখেন শালিখা। ইতিহাসে এর ভিত্তি মেলে না, তবে হেমন্তের শালি ধান আজও লোককথায় আছে।
প্রতিদিনের খাবার শহরের হোটেল আর বাজারে ভাত, নদীর মাছ বা মাংসের তরকারি, ডাল আর সবজি। আমাদের সূত্রে মাগুরার নিজস্ব কোনো বিশেষ পদের উল্লেখ নেই, তাই মৌসুমে কী পাওয়া যায়, স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞেস করুন।
দেখার মতো জায়গা
বাবুখালীর ঘোড়দৌড় ও মেলা
মহম্মদপুরের বাবুখালীতে আনুমানিক ১৮৯৮ সাল থেকে ১৬ মাঘ অনুষ্ঠিত ঘোড়দৌড়, ঘিরে তিন দিনের মেলা, জারি আর সারি গান।
ভাতের ভিটা বৌদ্ধবিহার
ফটকী নদীর পাড়ে টিলা গ্রামের ঢিবি, কিংবদন্তিতে যার নাম ভাতের ভিটা; খননে বেরিয়েছে মৌর্য থেকে গুপ্ত যুগের মধ্যকার এক বৌদ্ধবিহার।
শতখালীর চণ্ডীদাস ও রজকিনীর ঘাট
স্থানীয় ঐতিহ্যে কবি চণ্ডীদাস আর রজকিনীর বসতভিটা: যে দহে তিনি মাছ ধরতেন, আর তার ওপারে ধোপাখালী, যেখানে মেলে পুরোনো মৃৎপাত্রের টুকরো।
দুর্গ ও জমিদারবাড়িBhoboghure · CC BY 4.0ছান্দড়া জমিদার বাড়ি
শালিখায় ছান্দড়া জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, যেখান থেকে এ এলাকার খাজনা আদায় আর শাসন চলত; সীমাখালী বাজার থেকে ভ্যানে যেতে হয়।
স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধBhoboghure · CC BY 4.0মাঝাইলে ফররুখ আহমদের বাড়ি
'মুসলিম রেনেসাঁর কবি' ফররুখ আহমদের পৈতৃক বাড়ি ও পারিবারিক কবরস্থান, শ্রীপুরে তাঁর জন্মগ্রাম মাঝাইলে।
গোপালগ্রাম শাহি মসজিদ
শালিখার গোপালগ্রামে মুঘল রীতির মসজিদ, টালি ইট আর মাটি-সুরকিতে গড়া, গায়ে ফুলের নকশা; এখনকার নাম বাইতুন নূর জামে মসজিদ, আজও নিয়মিত নামাজ হয়।
পীর মোকাররম আলী শাহের দরগাহ ও হাজরাপুর নীলকুঠি
মাগুরা থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে ইছাখাদায় নবগঙ্গার তীরে সুফি দরগাহ, পাশেই হাজরাপুরের নীলকুঠি, যাকে ঘিরে ১৮৫৬–৬০ সালের নীল বিদ্রোহ হয়েছিল।
স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধBhoboghure · CC BY 4.0মুজদিয়ায় কাজী কাদের নওয়াজের বাড়ি
শ্রীপুরের মুজদিয়ায় কবি কাজী কাদের নওয়াজের বাড়ি, যেখানে তিনি ১৯৫২ সালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, আর তাঁর নামের পাঠাগার।
শহর ও ল্যান্ডমার্কFarabi Al Russell · CC BY-SA 4.0মাগুরা শহর ও নবগঙ্গা
নবগঙ্গার তীরে জেলা শহর: নদীর পাড়, নদীঘেঁষা আশ্রম ও মঠ, কাছেই আঠারো শতকের শিবমন্দির, আর নভেম্বরে কাত্যায়নী পূজার আলোকিত মণ্ডপ।
আঠারখাদার সিদ্ধেশ্বরী মঠ
মাগুরা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে আঠারখাদায় নবগঙ্গার তীরে একটি মঠ, যে জায়গা একসময় কালিকাতলা শ্মশান নামে পরিচিত ছিল।
দুর্গ ও জমিদারবাড়িMd Shehab Hossan · CC BY-SA 4.0রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ-দুর্গ
মুঘলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো জমিদারের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, মহম্মদপুরে: প্রাসাদ, শিবমন্দির, দশভুজা মন্দিরের ভিটা আর তলা পর্যন্ত ইটে বাঁধানো পুকুর।
শ্রীপুর জমিদার বাড়ি
শ্রীপুরে পাল চৌধুরী জমিদারদের বাড়ি, রবীন্দ্রনাথের ‘বৌ-ঠাকুরানীর হাট’-এর কাহিনির সঙ্গে জড়িত; সিংহদরজা আর ভেতরবাড়ির কিছু ঘর এখনো দাঁড়িয়ে।
তালখড়ির গোপাল জিউ (রাধাকৃষ্ণ) মন্দির
তালখড়ির সংরক্ষিত মন্দির, সাধক লোকনাথের জন্মস্থান হিসেবে স্মরণীয়; ১৯৭১-এ ক্ষতিগ্রস্ত, পরে সংস্কার করা, উৎসবে আজও পূজা হয়।
সূত্র 19
সময়, ভাড়া আর খোলার সময় বদলায়। যাওয়ার আগে একবার যাচাই করে নিন।
এই গাইডটি অফলাইনে নিয়ে যান।
একই গাইড, প্রতিটি জায়গা আর ছবি, ইন্টারনেট ছাড়াই আপনার ফোনে। পৌঁছে জেলাটি চিহ্নিত করুন।
