যার জন্য পরিচিত
- ১
গারো পাহাড় শুরু এখান থেকেই।
শেরপুরের উত্তর সীমানা জুড়ে ভারতের মেঘালয়, আর সীমান্তের আগের কয়েক কিলোমিটার লাল মাটির টিলা, শাল-গজারির বন আর পাহাড়ি ছড়ায় ভরা। যা দেখতে মানুষ আসে, তার প্রায় সবই এই পাহাড়ি পটিতে: গজনী, মধুটিলা, রাজার পাহাড়, পানিহাটা।
- ২
শেষ গাজীর নামে নাম।
মুঘল আমলে এ এলাকার নাম ছিল দশকাহনিয়া বাজু; ব্রহ্মপুত্র পার হতে দশ কাহন কড়ি লাগত বলেই নাকি এই নাম। পরে গাজী বংশের শেষ জমিদার শের আলী গাজীর নামে পরগনার নাম হয় শেরপুর। জেলা হয় ১৯৮৪ সালে।
- ৩
গারো, কোচ আর হাজং গ্রাম।
গারো, কোচ, হাজং, ডালু, বানাইসহ কয়েকটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে এই পাহাড়ি সীমান্তে আছে। রাজার পাহাড়ের পাশের বাবেলাকোনা আর গজনীর আশপাশের গ্রামে তাঁদের ঘরবাড়ি, গির্জা আর হাট দেখতে পাবেন।
- ৪
গ্রামে গ্রামে পুরোনো মসজিদ।
ঝিনাইগাতীর ঘাঘড়া খান বাড়ি মসজিদ, গড়জরিপার বারো দুয়ারী মসজিদ আর শহরের মাইসাহেবা মসজিদ জেলার সবচেয়ে পরিচিত পুরোনো স্থাপনা। প্রতিটির পেছনে একটা করে গল্প আছে, স্থানীয়রাই শোনাবেন।
- ৫
দেশের সবচেয়ে বড় মারীয় তীর্থ।
প্রতি বছর অক্টোবরের শেষে সীমান্তের বারোমারিতে ফাতেমা রানী মা মারিয়ার তীর্থে হাজার হাজার মানুষ আসেন। প্রথম সন্ধ্যার মোমবাতি হাতে জপমালার শোভাযাত্রা সবার জন্য খোলা।
- ৬
ছানার পায়েস আর তুলশীমালা চাল।
দুটোই জিআই পণ্য: শহরের শতবর্ষী ছানার পায়েস, আর ছোট দানার সুগন্ধি তুলশীমালা চাল, যা জেলা তার ব্র্যান্ড বানিয়েছে।
সেরা মৌসুম
ভালোমোটামুটিনভে–ফেব্রু
- বারোমারির ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব অক্টোবরের শেষে দুই দিন, নালিতাবাড়ী সীমান্তের তীর্থস্থানে
- শের আলী গাজীর মাজারের ওরস ১ ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি), গাজীর খামারে গ্রামীণ মেলাসহ
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পাহাড়ে যাওয়ার সময়: ঠান্ডা, শুকনো আর পরিষ্কার আকাশ। ভোরে গারো পাহাড়ে কুয়াশা, আর ওয়াচ টাওয়ার থেকে মেঘালয়ের টিলাগুলো স্পষ্ট। শীতের ছুটি আর পিকনিকের সপ্তাহান্তে গজনী আর মধুটিলায় ভিড় সবচেয়ে বেশি।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর সীমান্ত এলাকা সবচেয়ে ভেজা। বছরে প্রায় ২,১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, বেশিরভাগই এ সময়। মেঘালয়ে বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ছড়া আর ভোগাই, চেল্লাখালী, মালিঝি নদী হঠাৎ ফুলে ওঠে, আর রাজার পাহাড় ও পানিহাটার শেষ কাঁচা রাস্তা কাদা হয়ে যায়। বর্ষায় আর ধান কাটার মৌসুমে পাহাড় থেকে বুনো হাতি বেশি নামে; গ্রামের মানুষের কথা শুনবেন।
অক্টোবরের শেষে বারোমারির তীর্থোৎসব আর প্রথম ঠান্ডা রাত। অক্টোবর আর মার্চ মোটামুটি: দুপুরে গরম, তবে চারদিক সবুজ।
কীভাবে যাবেন
বাস
ঢাকা থেকে
সাড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা
মহাখালী থেকে ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুর শহর; নালিতাবাড়ী পর্যন্ত সরাসরি গেটলক সার্ভিসও আছে।
ট্রেন
ঢাকা থেকে
দেওয়ানগঞ্জ লাইনে জামালপুর পর্যন্ত, তারপর সড়কপথে; শেরপুরে স্টেশন নেই।
ঘুরে বেড়ানো
শেরপুর শহর থেকে পাহাড়ে
প্রায় এক ঘণ্টা
শাপলা চত্বর থেকে লোকাল বাস বা সিএনজিতে ঝিনাইগাতী বা নালিতাবাড়ী; রিজার্ভ অটোতে এক দিনে গজনী আর মধুটিলা।
ঢাকা থেকে বাসে যাওয়াই সবচেয়ে সহজ। মহাখালী থেকে ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুর শহরের বাস ছাড়ে; প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ, সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। সরাসরি বাসগুলো পথে কম থামে। মহাখালী থেকে সোজা নালিতাবাড়ী পর্যন্ত গেটলক সার্ভিসও আছে; মধুটিলা, পানিহাটা বা বারোমারিতে যেতে চাইলে তাতে একবার বাস বদলানো বাঁচে।
ট্রেনে গেলে ঢাকা–দেওয়ানগঞ্জ লাইনে জামালপুর নেমে বাকিটা সড়কপথে; শেরপুরে রেললাইন নেই।
জেলার ভেতরে শেরপুর শহরই কেন্দ্র। খোয়ারপাড়ের শাপলা চত্বর থেকে ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী আর শ্রীবরদীর লোকাল বাস, সিএনজি আর অটো ছাড়ে। গজনী আর মধুটিলা দুটোই শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার; সারাদিনের জন্য অটো বা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে দুটো একসঙ্গে ঘুরে আসাই চল। নালিতাবাড়ী শহর থেকে নন্নী বাজার হয়ে মধুটিলা, আর গড়কান্দা চৌরাস্তা হয়ে নাকুগাঁও, পানিহাটা ও বারোমারি।
স্থানীয় খাবার
ছানার পায়েসঅবশ্যই চেখে দেখুন
শেরপুর শহরের নিজস্ব মিষ্টি, ২০২৪ থেকে জিআই পণ্য; কেজি দরে বিক্রি হয়।
তুলশীমালা চাল
জেলার ব্র্যান্ড সুগন্ধি চাল; পোলাও, পায়েস আর পিঠার জন্য।
ছানার পায়েস শেরপুরের পরিচয়। ঘন দুধে অল্প এলাচ দিয়ে টাটকা ছানার ছোট ছোট গুটি জ্বাল দিয়ে বানানো হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে শেরপুর শহরে তৈরি হচ্ছে; নিউ মার্কেট এলাকার আর উপজেলা শহরের মিষ্টির দোকানে কেজি দরে বিক্রি হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এটি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায়।
তুলশীমালা চাল জেলার ব্র্যান্ড ফসল: ছোট দানার সুগন্ধি চাল, পোলাও, পায়েস আর পিঠায় লাগে। বাজারে চোখে পড়বে; এক ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন।
খাওয়ার জন্য শেরপুর শহরের নিউ মার্কেট এলাকার খাবার হোটেল আর নালিতাবাড়ীর মূল সড়কের হোটেলে ভাত, মাছ, ডাল পাবেন। গজনী আর মধুটিলায় রেস্তোরাঁর বদলে ক্যান্টিন আর পিকনিকের রান্নার জায়গা, তাই অনেকে খাবার সঙ্গে নিয়ে যান।
দেখার মতো জায়গা
বারোমারি ফাতেমা রানীর তীর্থস্থান
নালিতাবাড়ী সীমান্তে ১৯৪২ সালের ক্যাথলিক ধর্মপল্লী, ১৯৯৮ সালে মারীয় তীর্থস্থান ঘোষিত; অক্টোবরের শেষে দুই দিনের তীর্থোৎসবে হাজার হাজার মানুষ আসেন।
পার্ক ও পিকনিক স্পটমোঃ চঞ্চল মাহামুদ ভারুয়া · CC BY-SA 4.0গজনী অবকাশ কেন্দ্র
শেরপুরের প্রধান পাহাড়ি অবকাশ কেন্দ্র: গারো পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ৯০ একর শাল-গজারির বন, বাঁধ দেওয়া লেক, মেঘালয় দেখার ওয়াচ টাওয়ার, ক্যাবল কার, জিপলাইন আর ছোট একটা চিড়িয়াখানা।
মসজিদ ও মাজারBhoboghure · CC BY 4.0গড়জরিপা বারো দুয়ারী মসজিদ
শ্রীবরদীর গড়জরিপায় বারো দরজার মসজিদ, গড় জরিপা দুর্গের পুরোনো জায়গায়: প্রচলিত মতে শত শত বছর আগে জরিপ শাহের গড়া, ভূমিকম্পে মাটির নিচে, ১৯৬৩ সালে খুঁড়ে তুলে নতুন করে গড়া, এখন বড় দিঘির পাশে পাঁচতলা মসজিদ।
মসজিদ ও মাজারAyman Nakib Badhan · CC BY-SA 4.0ঘাঘড়া খান বাড়ি জামে মসজিদ
ঝিনাইগাতীর ঘাঘড়া লস্কর গ্রামে এক গম্বুজের ছোট মুঘল আমলের মসজিদ, ১৯৯৯ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণে; স্থানীয় কথায় প্রায় ৬০০ বছর আগে পরাজিত দুই সেনাপতি বনের ভেতর এটি গড়েছিলেন।
পার্ক ও পিকনিক স্পটShariful Islam Masum · CC BY-SA 4.0মধুটিলা ইকোপার্ক
নালিতাবাড়ী সীমান্তের পোড়াগাঁওয়ে বন বিভাগের ৩৮৩ একরের পাহাড়ি বনে ইকোপার্ক: বনের মাথার ওপর ওয়াচ টাওয়ার, নৌকাসহ লেক, স্টার ব্রিজ, মিনি চিড়িয়াখানা আর নিরিবিলি বনপথ।
মসজিদ ও মাজারSkmalamgir · CC BY-SA 4.0মাইসাহেবা জামে মসজিদ
শেরপুরের সবচেয়ে বড় মসজিদ, প্রচলিত মতে প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো আর বহুবার নতুন করে গড়া; শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে দেখা যায় এর দুই উঁচু মিনার, আর আছে এক হাতির গল্প।
পাহাড়George achik · CC BY-SA 4.0পানিহাটা-তারানি পাহাড়
মেঘালয়ের তুরা পাহাড়ের পাদদেশে দুই সীমান্ত গ্রাম, যেখানে ভোগাই নদী নুড়ির বিছানার ওপর দিয়ে পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসে; শেরপুরে পাহাড়ের সবচেয়ে পরিষ্কার আর সবচেয়ে নিরিবিলি দৃশ্য।
রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা
গারো পাহাড়ের শেরপুর অংশের সবচেয়ে উঁচু টিলা, ঢেউফা নদীর ওপরে প্রায় একশ হেক্টরের সমতল চূড়া, আর পাদদেশে গারো, হাজং ও কোচদের গ্রাম বাবেলাকোনা।
স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধBhoboghure · CC BY 4.0শের আলী গাজীর মাজার
শেরপুর পরগনার শেষ গাজী জমিদার, যাঁর নামে জেলার নাম, তাঁর কবর শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে গাজীর খামারে; প্রতি ১ ফাল্গুন ওরস আর গ্রামীণ মেলা।
সূত্র 14
সময়, ভাড়া আর খোলার সময় বদলায়। যাওয়ার আগে একবার যাচাই করে নিন।
এই গাইডটি অফলাইনে নিয়ে যান।
একই গাইড, প্রতিটি জায়গা আর ছবি, ইন্টারনেট ছাড়াই আপনার ফোনে। পৌঁছে জেলাটি চিহ্নিত করুন।
