যার জন্য পরিচিত
- ১
এক সংস্কারকের নামে জেলা।
জেলার নাম হাজী শরীয়তুল্লাহর (১৭৮১–১৮৪০) নামে, যিনি ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি নীলকর আর জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক ও তাঁতিদের নিয়ে ফরায়েজি আন্দোলন গড়েছিলেন। শরীয়তপুর জেলা হয় ১৯৮৪ সালে।
- ২
দুই বড় নদীর মাঝে।
উত্তরে পদ্মা, পূর্বে মেঘনা। দেশের দীর্ঘতম, ৬.১৫ কিলোমিটারের পদ্মা সেতু নেমেছে জাজিরায়, চালু হয় ২০২২ সালের ২৫ জুন। ভেতরে কীর্তিনাশা নদী গ্রাস করেছে রাজনগরে রাজা রাজবল্লভের বাসস্থান।
- ৩
মুঘলদের বিরুদ্ধে কেদার রায়।
বারো ভূঁইয়ার অন্যতম কেদার রায় (১৫৬১–১৬০৩) এখানে মানসিংহের মুঘল বাহিনীর সঙ্গে লড়েছিলেন। শ্রীনগরে মুঘলরা জেতে, নাম বদলে রাখে ফতেজঙ্গপুর, অর্থাৎ যুদ্ধজয়ের নগর। কেদারপুরে তাঁর অসমাপ্ত পরিখা আর মহিষারে তাঁর খোঁড়ানো দিঘি আজও আছে।
- ৪
রুদ্রকরের মঠ।
প্রায় ২০ মিটার উঁচু মন্দির, কোণে ছোট মন্দির, সামনে বিশাল পুকুর; পাশেই চক্রবর্তী জমিদারদের ১২–১৩ একর জুড়ে গড়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। মঠে টিয়া পাখির বাস, আর প্রতি বছর এখানে আজও পূজা আর কীর্তন হয়।
- ৫
সুরের দরবার সুরেশ্বর।
নড়িয়ায় পদ্মার পাড়ে সুফি আহমদ আলী জান শরীফ শাহ সুরেশ্বরী আল্লাহ ও রাসুলের প্রেমে সুর আর সংগীতকে সাধনার পথ করেছিলেন। ১৯০৭–১০ সালের জরিপে এক ইংরেজ কর্মকর্তা তাঁর কণ্ঠ শুনে গ্রামের নাম রাখেন সুরেশ্বর, সুর আর ঈশ্বর মিলিয়ে।
- ৬
ধানুকার মনসা বাড়ি।
ধানুকায় ময়ূর ভট্টের বাড়ি, প্রচলিত মতে প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো সংরক্ষিত পুরাকীর্তি; এখানে আছে সর্পদেবী মনসার পিতলের প্রাচীন মূর্তি। ধানুকা একসময় সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র ছিল।
- ৭
বুড়িরহাটের মসজিদ।
১৯০৭ সালে বুড়িরহাটের এক ব্যবসায়ী ছন আর গোলপাতায় এর সূচনা করেন, ১৯৩৫ সালে তা পূর্ণ রূপ পায় পাকা ভবনে; নকশা টিপু সুলতান মসজিদের আদলে, দেয়ালে চাঁদপুরের কারিগরদের রঙিন সিরামিক চূর্ণের লতাপাতা।
সেরা মৌসুম
ভালোমোটামুটিনভে–ফেব্রু
- মহিষারের মেলা পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) থেকে এক সপ্তাহ, দিগম্বরীর দিঘির পাশে
- সুরেশ্বর দরবারের ওরস ২–৪ ফেব্রুয়ারি, নড়িয়ায় পদ্মার পাড়ে
- চৈত্রসংক্রান্তি বাংলা বছরের শেষ দিন, এপ্রিলের মাঝামাঝি
- রুদ্রকর মঠে পূজা ও কীর্তন প্রতি বছর সাড়ম্বরে
- নৌকাবাইচ বর্ষায় নদীতে
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আসার সেরা সময়: শুকনো, পরিষ্কার আর মৃদু আবহাওয়া, শীতের রাতে তাপমাত্রা নামে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছে। মাঠ সবুজ, পদ্মার চর জেগে ওঠে, গ্রামের পথও শক্ত থাকে।
বছরে তাপমাত্রা ১২ থেকে ৩৫ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করে, বৃষ্টি হয় প্রায় ২,১০০ মিলিমিটার, তার বেশিরভাগ বর্ষায়। তখন পদ্মা আর মেঘনা ভরা আর খরস্রোতা, পাড় ভাঙে; নড়িয়ায় কেদার রায়ের জন্মস্থান আর পুরোনো রায়পুর গ্রাম আজ পদ্মার গর্ভে। বর্ষায় এলে শুধু নদী দেখতে আসুন, আর ভাঙা পাড় থেকে দূরে থাকুন।
সম্ভব হলে পহেলা বৈশাখ ধরে আসুন। বছরের প্রথম দিন থেকে কেদার রায়ের দিঘির পাশে মহিষারে বসে সপ্তাহব্যাপী মেলা; চৈত্রসংক্রান্তি আর নৌকাবাইচও জেলার লোক-উৎসবের অংশ।
কীভাবে যাবেন
বাস
ঢাকা থেকে
মাওয়া হয়ে পদ্মা সেতু পেরিয়ে জাজিরা, তারপর শরীয়তপুর শহর।
ট্রেন
ঢাকা থেকে
ঢাকা–যশোর রেলপথে সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে শিবচরের পদ্মা স্টেশন; তারপর সড়কপথে।
লঞ্চ
ঢাকা বা চাঁদপুর থেকে
ঢাকা থেকে নড়িয়া, আর চাঁদপুর থেকে নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জের লঞ্চ।
ঘুরে বেড়ানো
জেলার ভেতরে
অটো, সিএনজি ও রিকশা; রুদ্রকর শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, নড়িয়ায় বাস।
সড়কপথে পদ্মা সেতু হয়ে এখন যাওয়ার মূল পথ। ঢাকা থেকে এক্সপ্রেসওয়ে মাওয়া পর্যন্ত, তারপর ৬.১৫ কিলোমিটারের সেতু পেরিয়ে জাজিরা; বাস যায় শরীয়তপুর শহর, আর সেখান থেকে মাদারীপুর, বরিশাল ও ফরিদপুরে।
ট্রেনে, ঢাকা–যশোর রেলপথও একই সেতু দিয়ে যায়; এর পদ্মা স্টেশন সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে, সীমানার ঠিক ওপারে মাদারীপুরের শিবচরে। নৌপথে আজও নড়িয়া থেকে ঢাকা, আর নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ থেকে মেঘনা পেরিয়ে চাঁদপুরের লঞ্চ চলে।
জেলার ভেতরে অটো, সিএনজি আর রিকশাতেই বেশিরভাগ যাতায়াত। ধানুকার মনসা বাড়ি শহর থেকে অল্প রিকশাপথ, রুদ্রকর ডামুড্যা সড়কে প্রায় ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, আর ফতেজঙ্গপুর, সুরেশ্বর ও নদীর জন্য বাস যায় নড়িয়ায়।
স্থানীয় খাবার
জাজিরার কালোজিরা মধুঅবশ্যই চেখে দেখুন
জেলার নিজস্ব ব্র্যান্ড পণ্য, জাজিরার মসলার মাঠ থেকে।
মধুই জেলার নিজস্ব পরিচয়। শরীয়তপুর নিজেকে তুলে ধরে জাজিরার কালোজিরা মধু দিয়ে। জাজিরা মসলা চাষের কেন্দ্র: ২০১৮ সালে জেলায় প্রায় ৫,৫৭০ হেক্টরে ধনিয়া আর ৩,৭৫০ হেক্টরে জিরার চাষ হয়, আর মৌচাষিরা সরিষা, ধনিয়া ও লিচুর ফুলের মাঝে মৌবাক্স বসান।
বাকিটা মাঠের ফসল। ধান, পাট, গম, পেঁয়াজ, মিষ্টি আলু আর টমেটো প্রধান ফসল; পাট, পেঁয়াজ, আদা আর টমেটো যায় অন্য জেলায়।
মধু কিনুন বিশ্বস্ত খামার বা বাজার থেকে, আর কোন ফুলের মধু, জিজ্ঞেস করে নিন: সরিষা, ধনিয়া, কালোজিরা না লিচু।
দেখার মতো জায়গা
বুড়িরহাট জামে মসজিদ
১৯০৭ সালে ছন-গোলপাতায় শুরু, ১৯৩৫ সালে পাকা রূপ; টিপু সুলতান মসজিদের আদলে নকশা, ভেতরে রঙিন সিরামিকের লতাপাতা আর ৬০ ফুট উঁচু মিনার।
ছয়গাঁও জমিদার বাড়ি
ভেদরগঞ্জে দোতলা জমিদার বাড়ি, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কয়েকজন নেতার বাসস্থান; ১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এখানে ব্রিটিশ সেনাঘাঁটি ছিল।
মন্দিরShuvajit BD · CC BY-SA 4.0ধানুকার মনসা বাড়ি
ধানুকায় ময়ূর ভট্টের বাড়ি, প্রচলিত মতে প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো সংরক্ষিত মন্দিরগুচ্ছ, যেখানে আছে সর্পদেবী মনসার পিতলের প্রাচীন মূর্তি।
ডিঙ্গামানিক: রামসাধুর আশ্রম ও রাম ঠাকুরের বাড়ি
নড়িয়ার ডিঙ্গামানিকে শত বছরের পুরোনো আশ্রম, শীতের শেষে তিন দিনের মেলা; এই গ্রামেই ১৮৬০ সালে সাধক শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের জন্ম।
ফতেজঙ্গপুর দুর্গ ও কেদার রায়ের বেড়
যেখানে মানসিংহের মুঘল বাহিনী কেদার রায়কে হারিয়ে শ্রীনগরের নাম রাখে ফতেজঙ্গপুর, আর কেদারপুরে কেদার রায়ের অসমাপ্ত নগরের পরিখা।
দুর্গ ও জমিদারবাড়িBhoboghure · CC BY 4.0হাটুরিয়া জমিদার বাড়ি
গোসাইরহাটের চরভূয়াইয়ে জমিদার গোলাম আলী চৌধুরীর বাড়ি, ইট, সুরকি আর লোহায় গড়া; অযত্নে জীর্ণ হলেও এখনো শক্তভাবে দাঁড়িয়ে।
মহিষার ও দিগম্বরীর দিঘি
চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের নির্দেশে পানীয় জলের জন্য খোঁড়া দুটি বিশাল দিঘি, দিগম্বরীর মন্দির, কাছে ভাঙা "ভিয়া বাড়ি", আর পহেলা বৈশাখ থেকে সপ্তাহব্যাপী মেলা।
দৃষ্টিনন্দন স্থানAzim Khan Ronnie · CC BY-SA 4.0পদ্মা সেতু
দেশের দীর্ঘতম সেতু, পদ্মার ওপর ৬.১৫ কিলোমিটার, ওপরে সড়ক নিচে রেল, নেমেছে জাজিরায়; চালু ২০২২ সালের ২৫ জুন।
মন্দিরRadman Siddiki · CC BY 4.0রুদ্রকর মঠ ও জমিদার বাড়ি
প্রায় ২০ মিটার উঁচু মন্দির, কোণে ছোট মন্দির, সামনে বিশাল পুকুর; পাশে চক্রবর্তী জমিদারদের "বাবুর বাড়ি"র ধ্বংসাবশেষ।
স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধAbdul Hakim Madber · CC BY 4.0সুরেশ্বর দরবার শরীফ
নড়িয়ায় পদ্মার পাড়ে সুফি দরবার, প্রতিষ্ঠাতা সাধক সাধনায় সুর ব্যবহার করতেন; তাঁর কণ্ঠের জন্যই গ্রামের নাম সুরেশ্বর।
সময়, ভাড়া আর খোলার সময় বদলায়। যাওয়ার আগে একবার যাচাই করে নিন।
এই গাইডটি অফলাইনে নিয়ে যান।
একই গাইড, প্রতিটি জায়গা আর ছবি, ইন্টারনেট ছাড়াই আপনার ফোনে। পৌঁছে জেলাটি চিহ্নিত করুন।
