যার জন্য পরিচিত
- ১
পাহাড়ের ওপর বন্দরনগরী।
চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় শহর আর একমাত্র আসল বন্দর, কর্ণফুলী যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সেখানে ছড়ানো নিচু টিলার ওপর গড়া। জাহাজ, পরীর পাহাড়ের পুরোনো কোর্ট বিল্ডিং, আন্দরকিল্লার মুঘল মসজিদ আর ওয়ার সিমেট্রি, সব কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে।
- ২
রাস্তার শেষে সমুদ্র।
কর্ণফুলী যেখানে সাগরে ঢুকেছে, সেই পতেঙ্গা শহরের সন্ধ্যার জায়গা; নদীর ওপারের পারকি নিরিবিলি, আর উপকূল ধরে উত্তরের গুলিয়াখালী অদ্ভুত সুন্দর এক ম্যানগ্রোভ সৈকত, ঘাস নেমে গেছে পানিতে।
- ৩
সীতাকুণ্ড আর মীরসরাই।
শহরের উত্তরে পাহাড় নেমে এসেছে মহাসড়ক পর্যন্ত: হাজার ফুট চূড়ায় চন্দ্রনাথের মন্দির, ঝরনাসহ ইকোপার্ক, খৈয়াছড়ার নয় ধাপের ঝরনা আর মহামায়া লেক। ফেব্রুয়ারি বা মার্চের শিবচতুর্দশী মেলায় লাখো তীর্থযাত্রী পাহাড়ে ওঠেন।
- ৪
মেজবান আর শুঁটকি।
চট্টগ্রামের খাওয়া আলাদা: মেজবান, পাতলা ঝাল ঝোলের গরুর মাংসের ভোজ, একসঙ্গে শত শত মানুষকে খাওয়ানো; উপকূলের শুঁটকি অনেক রসুন দিয়ে ভুনা; আর পুরোনো শহরের কালাভুনা আর বেলা বিস্কুট।
- ৫
জব্বারের বলীখেলা।
১২ বৈশাখ, ২৫ এপ্রিলের কাছাকাছি, ১৯০৯ সালে আবদুল জব্বারের শুরু করা কুস্তির লড়াই লালদিঘিতে হয়, আর কাঠের আসবাব, মাটির জিনিস, গাছ আর মিষ্টির তিন দিনের মেলা চারপাশের গলি ভরিয়ে দেয়।
- ৬
পূর্ব আর দক্ষিণের দরজা।
এখান থেকে রাস্তা আর নদী গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, আর উপকূলের সড়ক দক্ষিণে কক্সবাজার; দক্ষিণ-পূর্বের বেশিরভাগ যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রামের স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে।
সেরা মৌসুম
ভালোমোটামুটিনভে–ফেব্রু
- শিবচতুর্দশী মেলা, সীতাকুণ্ড মহাশিবরাত্রি ঘিরে তিন দিন, ফেব্রুয়ারি বা মার্চ, চন্দ্রনাথ পাহাড়ে
- জব্বারের বলীখেলা ১২ বৈশাখ (প্রায় ২৫ এপ্রিল) লালদিঘিতে, তিন দিনের মেলাসহ
- বায়েজিদ বোস্তামীর ওরস প্রতি বছর নাসিরাবাদের মাজারে; প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভিড়
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি শুকনো, ঠান্ডা আর পরিষ্কার: সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে হাঁটা যায়, সন্ধ্যায় সৈকত সবচেয়ে ভালো, শহরের ভ্যাপসা গরম কমে। ফেব্রুয়ারি বা মার্চে চন্দ্রনাথে শিবচতুর্দশী মেলা, এপ্রিলের শেষে বলীখেলা।
বর্ষা জুন থেকে সেপ্টেম্বর, আর চট্টগ্রাম দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল শহরগুলোর একটা; পাহাড়ি রাস্তা ধসে, সীতাকুণ্ড আর মীরসরাইয়ের ছড়া বিপজ্জনক হয়, আর শহরের কাটা পাহাড়ে ধস সত্যিকারের ঝুঁকি। তবে ঝরনা ভরা থাকে শুধু তখনই: বৃষ্টির ঠিক পরে অক্টোবরে খৈয়াছড়া, বেশিরভাগ মানুষের মধ্যপথ এটাই।
ঘূর্ণিঝড় মে আর অক্টোবর-নভেম্বরে বঙ্গোপসাগর থেকে আসে; সতর্কতা থাকলে সৈকত আর নদী থেকে দূরে থাকুন।
কীভাবে যাবেন
ট্রেন
ঢাকা থেকে
৫–৭ ঘণ্টা
কমলাপুর থেকে সুবর্ণ, সোনার বাংলা, মহানগর, তূর্ণা প্রভৃতি, চট্টগ্রাম স্টেশনে।
বাস
ঢাকা থেকে
প্রায় ৬ ঘণ্টা
সায়েদাবাদ ও আরামবাগ থেকে দিনরাত, কুমিল্লা হয়ে।
আকাশপথ
ঢাকা থেকে
প্রায় এক ঘণ্টা
পতেঙ্গার শাহ আমানত বিমানবন্দরে দিনে কয়েকটি ফ্লাইট।
ঘুরে বেড়ানো
শহর থেকে সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই
১–২ ঘণ্টা
ঢাকা মহাসড়কের উত্তরমুখী যেকোনো বাস; বাজার থেকে পাহাড়ে সিএনজি বা অটো।
ট্রেনে ঢাকার কমলাপুর থেকে: সুবর্ণ, সোনার বাংলা, মহানগর, তূর্ণাসহ আন্তঃনগর ট্রেনে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টায় শহরের মাঝের চট্টগ্রাম স্টেশন। বাসে সায়েদাবাদ আর আরামবাগ থেকে দিনরাত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লা হয়ে, প্রায় ছয় ঘণ্টা। বিমানে পতেঙ্গার শাহ আমানত বিমানবন্দরে ঢাকা থেকে দিনে কয়েকটি ফ্লাইট।
শহরে সিএনজি আর রাইড শেয়ারিং অ্যাপে সব জায়গায় যাওয়া যায়; কোর্ট বিল্ডিং, আন্দরকিল্লা, ওয়ার সিমেট্রি আর আগ্রাবাদ কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে। পতেঙ্গা আর বিমানবন্দর এয়ারপোর্ট রোডে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে; ফয়’স লেক শহরের উত্তরে খুলশীতে।
শহরের বাইরে উত্তরের ঢাকা মহাসড়ক ধরে সীতাকুণ্ড (প্রায় ৩৫ কিলোমিটার) আর মীরসরাই (প্রায় ৬০): উত্তরমুখী যেকোনো বাস সীতাকুণ্ড বাজার, বড় দারোগাহাট বা খৈয়াছড়ার মোড়ে নামিয়ে দেয়। পারকি কর্ণফুলীর ওপারে টানেল বা আনোয়ারার রাস্তায়; বাঁশখালী উপকূলের সড়কে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
স্থানীয় খাবার
মেজবানঅবশ্যই চেখে দেখুন
ছোলার ডালসহ পাতলা ঝাল ঝোলের গরুর মাংস, চট্টগ্রামের ভোজ।
শুঁটকিঅবশ্যই চেখে দেখুন
রসুন-মরিচে ভাজা লইট্টা, ছুরি বা চিংড়ি শুঁটকি।
কালাভুনা
প্রায় কালো হওয়া পর্যন্ত ধীরে রান্না গরুর মাংস।
বেলা বিস্কুট
পুরোনো শহরের শক্ত মিষ্টি রুটি, চায়ের সঙ্গে।
মেজবান জেলার বড় খাবার: পাতলা, কড়া মসলার ঝোলে গরুর মাংস, সঙ্গে ছোলার ডাল আর সাদা ভাত, বিয়ে, মৃত্যুর অনুষ্ঠান আর সমাজের ভোজে সারিতে বসা শত শত অতিথিকে খাওয়ানো। কিছুদিন থাকলে নিমন্ত্রণ পাবেনই; নইলে শহরের কয়েকটা রেস্তোরাঁয় রোজ মেজবানি মাংস পাওয়া যায়।
শুঁটকি, উপকূলের শুকনো মাছ, চট্টগ্রামের অন্য স্বাদ: লইট্টা, ছুরি আর চিংড়ি শুঁটকি রসুন-মরিচে ভাজা, বা কুমড়া দিয়ে রান্না। কালাভুনা, প্রায় কালো হওয়া পর্যন্ত ধীরে রান্না করা গরুর মাংস, এখানকারই, আর পুরোনো শহরের বেলা বিস্কুট, চায়ে ডোবানো শক্ত মিষ্টি রুটি, আন্দরকিল্লার বেকারিতে বিক্রি হয়।
সাগর থেকে সরাসরি মাছ খেতে পতেঙ্গা আর পারকির দোকানে সেদিন যা উঠেছে তা-ই ভাজা; আগ্রাবাদ আর জিইসিতে শহরের রেস্তোরাঁ।
দেখার মতো জায়গা
মসজিদ ও মাজারIqbal Hossain · CC BY-SA 4.0আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ
ভেতরের দুর্গের টিলায় ১৬৬৭ সালের মুঘল মসজিদ, বাবা শায়েস্তা খান আরাকানিদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম নেওয়ার পরের বছর বুজুর্গ উমেদ খানের গড়া; শহরের প্রধান মসজিদ, দরজার ওপর ফারসি শিলালিপি।
পার্ক ও পিকনিক স্পটAzim Al Jabber · CC BY-SA 3.0বাঁশখালী ইকোপার্ক
শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁশখালীর শীলকূপে হাজার হেক্টর পাহাড়ি বন, দুটো লেক আর ঝুলন্ত সেতু, ২০০৩-এ ইকোপার্ক ঘোষিত, কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে সাগরের লম্বা উপকূল।
স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধRohan Uddin Fahad · CC BY-SA 3.0বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার
নাসিরাবাদে টিলার ওপর পারস্যের সুফি বায়েজিদ বোস্তামীর নামে মাজার, মুঘল আমলের মসজিদ আর তীর্থযাত্রীদের খাওয়ানো বিরল বোস্তামী কাছিমে ভরা পুকুরসহ; প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভিড়।
পাহাড়Saptorsikundu18 · CC BY-SA 4.0চন্দ্রনাথ পাহাড়
সীতাকুণ্ডের ওপরে হাজার ফুটের পাহাড়, চূড়ায় চন্দ্রনাথ শিবমন্দির, এক শক্তিপীঠ আর জেলার বড় তীর্থ; খাড়া সিঁড়ি আর বনের পথে ওঠা, চূড়া থেকে সাগর আর পাহাড়, আর শিবচতুর্দশীতে লাখো তীর্থযাত্রী।
স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধAzim Al Jabber · CC BY 2.5চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং
পুরোনো শহরের ওপরে পরীর পাহাড়ে ১৮৯৮ সালের লাল ইন্দো-সারাসেনিক আদালত ভবন: গম্বুজ, খিলানের সারি আর লম্বা সম্মুখভাগ, এখনো জেলা আদালত, নিচে ছড়ানো নদী আর বন্দর।
জাদুঘরMoheen Reeyad · CC BY-SA 4.0জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর
আগ্রাবাদে দেশের একমাত্র জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর: চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, খাসিসহ নানা জনগোষ্ঠীর পোশাক, হাতিয়ার, ঘর আর হস্তশিল্পের গ্যালারি, ১৯৭৪ থেকে খোলা।
পার্ক ও পিকনিক স্পটMoheen Reeyad · CC BY-SA 4.0ফয়’স লেক
১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের খুলশীর পাহাড়ের মাঝে বাঁধ দিয়ে তৈরি লেক, ইংরেজ প্রকৌশলীর নামে; এখন পানির চারপাশে বিনোদন পার্ক, নৌকা আর রিসোর্ট, শহরের পরিবার নিয়ে বেড়ানোর জায়গা।
সমুদ্রসৈকতSyed Sajidul Islam · CC BY-SA 4.0গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত
দেশের আর কোনো সৈকতের মতো নয়, সীতাকুণ্ড উপকূলের মুরাদপুরে: সবুজ ঘাস আর কেওড়ার ম্যানগ্রোভ ঢেউ আর নালা হয়ে সোজা সাগরে নেমে গেছে, নৌকা, বক আর খোলা আকাশ। ২০১৪ পর্যন্ত অজানা, এখন সংরক্ষিত পর্যটন এলাকা।
ঝরনাOwais Al Qarni · CC BY-SA 4.0খৈয়াছড়া ঝরনা
মীরসরাইয়ের ঝরনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়, বনে ঢাকা গিরিখাতে একটার ওপর একটা নয়টা মূল ধাপ, মহাসড়ক থেকে ছড়া ধরে ভেজা পাথুরে ট্রেকে যাওয়া; বর্ষা থেকে অক্টোবর সবচেয়ে ভালো।
নদী, হ্রদ ও হাওরHasib · CC BY-SA 4.0মহামায়া লেক
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ, ২০১০-এ শেষ হওয়া সেচ বাঁধে মীরসরাইয়ের পাহাড়ের মাঝে আটকানো ১১ বর্গকিলোমিটার পানি: নৌকা, কায়াক, ওপারে ঝরনা আর চারদিকে সবুজ টিলা।
সমুদ্রসৈকতAzim Al Jabber · CC BY-SA 3.0পারকি সমুদ্র সৈকত
কর্ণফুলীর মোহনার আনোয়ারার দিকে ১৩ কিলোমিটার বালু আর ঝাউবন, পানির ওপারে পতেঙ্গার মুখোমুখি; শহরের সৈকতের চেয়ে নিরিবিলি, দিগন্তে বন্দরের জাহাজ, আর ২০২৩ থেকে পৌঁছানোর জন্য টানেল।
সমুদ্রসৈকতMoheen Reeyad · CC BY-SA 4.0পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত
শহরের সৈকত, ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে কর্ণফুলীর মোহনায়: বঙ্গোপসাগরমুখী লম্বা কংক্রিট আর পাথরের বাঁধ, দূরে অপেক্ষায় জাহাজ, মাছভাজার দোকান আর সূর্যাস্ত দেখতে বেরোনো গোটা চট্টগ্রাম।
পার্ক ও পিকনিক স্পটMd Raisul Islam2019 · CC BY-SA 4.0সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক
চন্দ্রনাথের নিচের বনে ঢাকা ঢালে উদ্ভিদ উদ্যান ও ইকোপার্ক, পথের শেষে সহস্রধারা আর সুপ্তধারা ঝরনা, একটা লেক আর উপকূলের দিকে ভিউপয়েন্ট।
স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধAzim Al Jabber(azimiiuc@yahoo.com) · CC BY-SA 3.0চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি, বাদশা মিয়া রোডে গাছের নিচে প্রায় সাতশ কবরের লন: বার্মা রণাঙ্গনে মারা যাওয়া ব্রিটেন, ভারত, আফ্রিকা, বার্মা, জাপান আর নেদারল্যান্ডসের সৈনিক ও বৈমানিক।
সময়, ভাড়া আর খোলার সময় বদলায়। যাওয়ার আগে একবার যাচাই করে নিন।
এই গাইডটি অফলাইনে নিয়ে যান।
একই গাইড, প্রতিটি জায়গা আর ছবি, ইন্টারনেট ছাড়াই আপনার ফোনে। পৌঁছে জেলাটি চিহ্নিত করুন।
